Friday, 18 August 2017

রোহিঙ্গা সমস্যা : মায়ানমারের বর্বর নীতির দায়ভার বাংলাদেশ বহন করবে কেন?


অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) মহাসচিব ইউসেফ বিন আহমদ আল ওসাইমিন-এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যু নতুন করে আলোচনায় উঠেছে। চারদিনের এ সফরে তিনি দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি আলোচনার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোটের এই নেতা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আর্কষণ করেছেন। একইসঙ্গে স্বদেশে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মায়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে বিশ্বনেতা/আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যতটা তৎপর রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে ঠিক কতটুকু তৎপর এ প্রশ্ন হয়ত করা যেতেই পারে।
রোহিঙ্গা সমস্যাটি সাম্প্রতিক কোন ঘটনা না। জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে। সামরিক সরকার তখন সে দেশে বে-আইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য একটি পদক্ষেপ নেয়। ১৯৭৭ সালে সামরিক জান্তা সরকার গৃহীত সেই পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। ১৯৭৮ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনীর ‘নাগামান’ (‘ড্রাগন রাজা’) অভিযানের ফলে প্রায় দুই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তখন বাংলাদেশের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়। কিন্তু মায়ানমার জান্তা সরকার ১৯৮২ সালে এমনভাবে নাগরিক আইন সংশোধন করে যা রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। সামরিক সরকার দাবি করে ‘রোহিঙ্গা’ বলে কোন গোত্র তাদের দেশে নেই, এই জনগোষ্ঠী আদতে পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া অবৈধ জনগোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তী মায়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা শত বছর ধরে আরাকান রাজ্যে বসবাস করছেন। এবং তারা মায়ানমারের বৈধ নাগরিক। মূলত রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার মাধ্যমে, তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে মায়ানমারের উগ্র-মৌলবাদী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মায়ানমারকে একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যই এমন কূটকৌশল বেছে নেয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের প্রেক্ষিতে সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়। ধর্মীয়ভাবেও তাদের উপর অত্যাচার শুরু হতে থাকে তখন। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে যেন নিয়মিত ঘটনা। তাদের সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয় না। সন্তান হলে নিবন্ধন করা হয় না। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য তাদের ওপর আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর পুনরায় নির্যাতন শুরু হলে তখন প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইনের মংডুতে সীমান্তরক্ষীদের পোস্টে সন্ত্রাসী হামলায় রোহিঙ্গাদের দায়ী করে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে কমপক্ষে ৭০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় পালিয়ে আসে বলে বিভিন্ন সংস্থা সূত্রে বলা হয়। ১৯৭৯ সালের পর থেকে যেসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছিলেন মায়ানমার তাদের অনেককেই আর ফিরিয়ে নেয়নি। মায়ানমারের উগ্র মৌলবাদী বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে ইউএনএইচসিআরের বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০১৬তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজার। আর তাদের পরিচালিত শরণার্থী শিবিরে রয়েছে ৩৩ হাজার ২০৭ জন। অর্থাৎ সব মিলে বাংলাদেশে মায়ানমার থেকে আসা নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ২০৭। বাংলাদেশ সরকার এ সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখের ভেতর বলে দাবি করে। বাংলাদেশ-মায়ানমার সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির ফলে ১৯৯২ সালের ১৫ মে ৬ মাসের মধ্যে মায়ানমার সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মায়ানমার সরকার মাত্র ২২ হাজার শরণার্থীকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে। বাকিদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যাটি দু’দেশের সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা হিসেবে রয়েই গেছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আর মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। বাংলাদেশও এখন এ সমস্যার সাথে বেশ ভালোভাবে জড়িত। মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে সত্য কিন্তু এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা বিবেচনা করার সময় এসেছে। বাংলাদেশ এমনিতেই নিজের জনসংখ্যা চাপে ন্যুব্জ, নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হয়; এরমধ্যে বছরের পর বছর শরণার্থীদের বাড়তি চাপ সহ্য করার যৌক্তিকতা ভাববার সময় এসেছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ব্যবসা, অস্ত্রব্যবসা, এবং চোরাচালানির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এমন খবরও গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে টেকনাফে সংরক্ষিত বিরল বনাঞ্চল এরই মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব সমস্যা ছাড়াও বিরাট অংকের রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের কারণে এদেশের অর্থনীতির ওপরে তার প্রভাব পড়ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা কোন সাময়িক বিপর্যয় নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে আসা এথনিক ক্লিনজিং। তাই এই সমস্যাকে আর মানবিক হিসেবে বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই। মায়ানমার সরকার চায় রোহিঙ্গার দায় সব সময়ের জন্য বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দিতে। মায়ানমারের শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই প্রকাশ্যে এই রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এ জন্য এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে খুব বেশি সতর্ক হতে হবে। শুধু ভাষা, ধর্ম কিংবা নৃতাত্ত্বিক গঠনে সাদৃশ্য থাকার কারণেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের দায়ভার নিতে পারে না। বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব মায়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য সার্ক, আসিয়ান, ওআইসিসহ আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর দারস্থ হওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে সমস্যাটি জাতিসংঘেও উত্থাপন করা যেতে পারে। রোহিঙ্গারা যেহেতু শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে নিজদেশে অত্যাচারিত, এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জোট হিসেবে ওআইসি এ সমস্যা সমাধানে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা উদ্বেগজনক, বিশ্বনেতাদের তা অনুধাবন করানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাটি আন্তর্জাতিকীকরণ করার উদ্যোগ নিতে পারে। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয় সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মায়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। দু’দেশের সীমান্ত সমস্যা, সমুদ্রসীমা নির্ণয়, সীমান্তে চোরাচালান, রোহিঙ্গা সমস্যা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপড়েন সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা তেমন উল্লেখ করার মতো নেই। দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমার হিস্যা নির্ধারিত হয়ে গেছে। ইদানীং চোরাচালানও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে। একমাত্র রোহিঙ্গা সমস্যাই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধান বাধা। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দু’দেশের খুব বেশি আন্তরিক হওয়া জরুরি। আর বাংলাদেশ যদি এ সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয় তাহলে সারাজীবন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভার বয়ে বেড়াতে হবে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান জরুরি


গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি’র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে দুবছর আগে মিয়ানমারে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা সামরিক শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। সঙ্গত কারণেই সু চি’র দলের কাছে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা একটু বেশি ছিল। সবাই ভেবেছিল, মিয়ানমারে এবার সত্যিকার অর্থে সুশাসন, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশেষ করে সেদেশের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রত্যাশা ছিল একটু বেশি। রোহিঙ্গারা ভেবেছিল, সু চি’র সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় অধিকার ফিরিয়ে দেবে; সুখ-শান্তিতে তারা মিয়ানমারে বসবাস করতে পারবে। নির্বাচনী প্রচারে রাখাইন রাজ্যে গিয়ে সু চি বলেছিলেন, জাতিগত ও ধর্মীয় বঞ্চনা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা জরুরি। দেশের সব মানুষকে এক হতে হবে। একে অপরের প্রতি ঘৃণা ও ভীতি প্রদর্শন কোনো সফলতা বয়ে আনে না।
সরাসরি না হলেও তার এ কথায় ভরসা পেয়েছিল রাখাইনে (একসময় আরাকান রাজ্য নামে পরিচিত) বসবাসরত সংখ্যালঘু নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হতে তাদের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও দেখা গেল তাদের ওপর অত্যাচার থেমে নেই। শান্তিতে নোবেলবিজয়ী অং সান সুচিও ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যুতে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। মিয়ানমারে ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠী স্বীকৃত হলেও রোহিঙ্গারা শুধু মুসলিম হওয়ায় সরকারের স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। কারণে-অকারণে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালায় উগ্রতাবাদী বৌদ্ধরা। এতে অনেকে প্রাণ হারায়, অনেকে দেশত্যাগে বাধ্য হয়। উগ্র বৌদ্ধদের অত্যাচার-নির্যাতন রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত রাষ্ট্রবিহীন সম্প্রদায়ে পরিণত করেছে।
রোহিঙ্গা সমস্যাটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে। সামরিক সরকার তখন বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধে একটি পদক্ষেপ নেয়। ১৯৭৭ সালে গৃহীত সে পদক্ষেপের ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘নাগামান’ (ড্রাগন রাজা) অভিযানের ফলে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তখন বাংলাদেশের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হয় তাতে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে এমনভাবে আইন সংশোধন করে, যা রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। সামরিক সরকার দাবি করে, ‘রোহিঙ্গা’ বলে কোনো গোত্র তাদের দেশে নেই; এ জনগোষ্ঠী আদতে পূর্ববাংলা থেকে যাওয়া অবৈধ জনগোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গা মুসলিমরা শত বছর ধরে আরাকান রাজ্যে বসবাস করছে; তারা মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক। মূলত রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব অস্বীকারের মাধ্যমে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী দেশটিকে একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রে পরিণত করতেই এমন কূটকৌশল বেছে নেয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের প্রেক্ষাপটে সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়। ধর্মীয়ভাবেও তাদের ওপর অত্যাচার শুরু হয় তখন। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়াসহ বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়। বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না। সন্তান হলে নিবন্ধন বা জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য তাদের ওপর আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।
১৯৯২ সালে আবার নির্যাতন শুরু হলে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইনের মংডুতে সীমান্তরক্ষীদের পোস্টে সন্ত্রাসী হামলায় তাদের দায়ী করে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। গড়ে অন্তত ৭০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় পালিয়ে আসে বলে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়। ১৯৭৯ সালের পর থেকে যেসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছিল, মিয়ানমার তাদের অনেককেই আর ফিরিয়ে নেয়নি। দেশটির উগ্র বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ইউএনএইচসিআরের বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০১৬তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দুই লাখ ৪৩ হাজার। আর তাদের পরিচালিত শরণার্থী শিবিরে রয়েছে ৩৩ হাজার ২০৭ জন। অর্থাৎ সব মিলে মিয়ানমার থেকে আসা নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দুই লাখ ৭৬ হাজার ২০৭ জন। বাংলাদেশ সরকার এ সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখের ভেতর বলে দাবি করে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সরকার স্বাক্ষরিত চুক্তির ছয় মাসের মধ্যে মিয়ানমার সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মিয়ানমার মাত্র ২২ হাজার শরণার্থীকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করলেও বাকিদের করে না। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যাটি দুদেশের সম্পর্কে একটি সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে।
অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) মহাসচিব ইউসেফ বিন আহমদ আল ওসাইমিনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যু নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। চার দিনের এ সফরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি আলোচনার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোটের এ নেতা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোয় তিনি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই সঙ্গে স্বদেশে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে বিশ্বনেতা, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যত তৎপর, তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে ঠিক কতটুকু তৎপর এ প্রশ্ন করা যেতেই পারে।

রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বাংলাদেশও এখন এ সমস্যার সঙ্গে জড়িত। মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে সত্য; কিন্তু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বিবেচনার সময় হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ এমনিতেই নিজের জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ, নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে বছরের পর বছর শরণার্থীদের বাড়তি চাপ সহ্যের যৌক্তিকতা ভাববার সময় এসেছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক, অস্ত্র ব্যবসা ও চোরাচালানিতে যুক্ত হচ্ছেÑএমন খবরও গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাদের অবস্থানের কারণে টেকনাফে সংরক্ষিত বিরল বনাঞ্চল এরই মধ্যে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব সমস্যা ছাড়াও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভরণ-পোষণের কারণে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ সমস্যা কোনো সাময়িক বিপর্যয় নয়, দীর্ঘ কয়েক যুগের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে আসা ‘এথনিক ক্লিনজিং’। তাই এ সমস্যাকে আর মানবিক হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। মিয়ানমার সরকার চায়, রোহিঙ্গার দায় সব সময়ের জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে। দেশটির শাসক গোষ্ঠী প্রকাশ্যেই রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়ে থাকে। এ জন্য এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে খুব বেশি সতর্ক হতে হবে। শুধু ভাষা, ধর্ম কিংবা নৃতাত্ত্বিক গঠনে সাদৃশ্য থাকাতেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের দায়ভার নিতে পারে না। বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এ জন্য সার্ক, আসিয়ান, ওআইসিসহ আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হওয়া যেতে পারে। সমস্যাটি জাতিসংঘেও উত্থাপন করা যেতে পারে। রোহিঙ্গারা যেহেতু শুধু মুসলিম হওয়ায় নিজ দেশে অত্যাচারিত, সে ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জোট হিসেবে ওআইসি এ সমস্যা সমাধানে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু কতটা উদ্বেগজনক, বিশ্বনেতাদের তা অনুধাবন করানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাটি আন্তর্জাতিকীকরণে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এ ইস্যুতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সীমান্ত সমস্যা, সমুদ্রসীমা নির্ণয়, সীমান্তে চোরাচালান, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন টানাপড়েন চলছে। বর্তমানে দুদেশের সীমান্ত সমস্যা তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। সমঝোতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আদাল॥তে সমুদ্রসীমার হিস্যা নির্ধারিত হয়ে গেছে। ইদানীং চোরাচালানও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে। একমাত্র রোহিঙ্গা সমস্যাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে বাধা বলে প্রতীয়মান। তাই এ সমস্যা সমাধানে দুদেশকেই আন্তরিক হতে হবে।

বন্যায় আক্রান্ত স্বদেশ : দুর্ভোগ কমাতে করণীয়


উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। স্মরণকালের এই ভয়াবহ বন্যায় এরই মধ্যে দেশের ২১টি জেলা মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়েছে। এর বাইরেও পার্বত্য অঞ্চলের কিছু এলাকা বন্যায় আক্রান্ত। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, আত্রাই, সুরমাসহ কয়েকটি নদ-নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে দেশের মধ্যাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞ মহল। অর্থাত্ বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরো নতুন কিছু জেলা বন্যাকবলিত হতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছরই বন্যাকবলিত হয়। অতিবৃষ্টির ফলে নদীর পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যায় বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ— এসব জেলার নিম্নাঞ্চল একটু ভারি বৃষ্টিপাত হলে সহজেই বন্যাকবলিত হয়। নদী-নালা, খাল-বিল প্লাবিত হয়ে বন্যার পানি উপচে পড়ে সমতল ভূমিতে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ সবই তখন অথৈ জলে ভাসে।
অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যার কারণে এরই মধ্যে অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অনেকের বসতবাড়ি। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, দেশের ২১ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ। মহাসড়কে পানি ওঠায় বিভিন্ন জেলায় সরাসরি পথে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া খবরে প্রকাশ লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে তিনটি পথে রেলযোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বন্যায় কৃষকের প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বলতে গেলে, এক প্রকার বানের জলে ভাসছে সাধারণ মানুষের নিয়তি। এসব বানভাসি মানুষের মানবেতর জীবনের গল্প গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদনসহ প্রকাশ হচ্ছে। দুর্গত মানুষের দুর্ভোগের কথা লিখে বোঝানো সম্ভব না।
বন্যাকবলিত এলাকায় যে ত্রাণসামগ্রী দেয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল; তাও বন্যার্তদের অনেকেই পাচ্ছে না বলে অভিযোগ। অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এটি খুবই দুঃখজনক। সরকারের উচিত এ বিষয়ে কঠোর হওয়া, যাতে অসহায় মানুষের মুখের অন্ন কেউ কেড়ে খেতে না পারে। বানভাসি একজন মানুষও যেন খাদ্যাভাবে, সাহায্যের অভাবে, চিকিত্সার অভাবে মারা না যায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখা উচিত। বন্যার্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করা শুধু সরকারের নয়, সবার মানবিক দায়িত্ব। তাদের প্রতি সবাইকে সদয় হতে হবে।
বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবার নতুন সমস্যা দেখা দেবে। বন্যাকবলিত অঞ্চলের অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হবে। দেখা দেবে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের অভাবে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি তো আছেই। ঘরবাড়ি, গৃহপালিত পশু, ফসলি জমি, মাছের ঘের, বীজতলা প্রভৃতি নষ্ট হওয়ার কারণে অনেকে মারাত্মক সংকটে পড়বে, তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য সরকারকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই সব হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যায়। অনেকে আর্থিক সচ্ছলতার জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, যা সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। সুতরাং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ব্যাংকঋণ মওকুফের পাশাপাশি চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণ করতে হবে।
বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করা অসম্ভব নয়। বন্যাকবলিত মানুষের সাহায্যার্থে তাই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ছাত্রসমাজ ও সমাজের বিত্তশালী মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী ও চিকিত্সা সরবরাহ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত একজন মানুষও যেন সাহায্যের অভাবে নিজেকে অসহায় না ভাবে, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

Thursday, 3 August 2017

আরব বসন্ত পরবর্তী ভূ-রাজনীতি ও কাতার সংকট


পারস্য উপসাগরের দেশ কাতার ইস্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এখন বেশ উত্তপ্ত বাতাস বইছে। কাতারের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেট (আইএস), মুসলিম ব্রাদারহুড ও আল কায়েদার মতো বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনকে মদত দেয়ার অভিযোগ এনে সৌদি আরব এবং এর চারটি মিত্র আরবদেশ (সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও মিসর) কাতারের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এই ঘোষণা আসে। এরপর থেকে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ কাতারকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি উত্তপ্ত হতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জামাল উদ্দীন আফগানির নেতৃত্বে সর্ব ইসলামবাদ বা প্যান ইসলামিক আন্দোলন শুরু হয়। এটি একটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ আন্দোলন। এ কথা সত্য যে, জামাল উদ্দিন আফগানি ইসলামি আইন ও ধর্মতত্ত্বের চেয়ে রাজনৈতিক দিককেই বেশি আলোকপাত করেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ আন্দোলন ব্যর্থ হলেও একবিংশ শতাব্দীতে এসে মুসলিম নেতাদের মনে প্যান ইসলামিজমের চেতনা জাগ্রত হয়। এ সময় মিসর ও আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশে ইসলামপন্থিদের বিজয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব স্বাভাবিকভাবে নিলেও এক ধরনের শঙ্কায় ছিল। এমতাবস্থায় বৈষয়িক স্বার্থ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েল মিলে আরব সমাজে নানা ধরনের ফাটল তৈরি করে। আরব জাতির গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তাদের স্বার্থ হাসিল করে।
মূলত হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজা পুনর্গঠনে কাতারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দান, মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগিতা, কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র স্বার্থবিরোধী সম্প্রচার, কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ এবং কাতারের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন মধ্যপ্রাচ্যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর এমন নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার অন্যতম কারণ। মিসরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল সিসি ক্ষমতা গ্রহণ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের উপর নির্যাতন ও দমনমূলক আচরণ শুরু করেন। কাতার তখন জেনারেল সিসির অত্যাচারে দেশ ত্যাগ করা ব্রাদারহুডের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আশ্রয় দান করে। এছাড়া ‘হামাস’কে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক শীতল হয়। সৌদি আরব যেসব দাবিতে কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, এর মধ্যে একটি হলো ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলন হামাসকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করা। কাতার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা উপত্যকায় নতুন বাড়ি, হাসপাতাল ও সড়ক নির্মাণে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে।
সৌদি আরব ও তার চার মিত্র প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কচ্ছেদ করার পর থেকে কাতার এখন মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট, কারণ কাতারকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়। অবরোধের কারণে সমুদ্র ও আকাশপথে কাতারকে খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ইরান আকাশপথে ও জাহাজে করে কাতারে প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিচ্ছে।
সৌদি জোট কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ও অবরোধ তুলে নেয়ার শর্ত হিসেবে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে। এসব দাবির মধ্যে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক হ্রাস, সন্ত্রাসী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস, আল কায়েদা ও আইএসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, আমিরাতে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা, সৌদি জোট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে তাদের আর্থিক সাহায্য দান বন্ধ করা, কাতারভিত্তিক আলজাজিরা চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় চার দেশ ও মিসরের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করা, সৌদি আরব, বাহরাইন, মিসর ও আমিরাত যেসব ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করেছে তাদের স্থানান্তর করা এবং এসব দেশের ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করা প্রভৃতি অন্যতম। সৌদি জোট যে শর্তগুলো দিয়েছে তার অনেকগুলোই কাতারের জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং মিসরবিরোধী সম্প্রচারের জন্য আলজাজিরা বন্ধের দাবি উঠেছে, কাতার এটা মেনে নেবে না। কাতারের নিরাপত্তার স্বার্থে তুরস্ক যে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে কাতার এটাও বন্ধ করবে না, এটাই স্বাভাবিক। আবার কাতার নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক নষ্ট করবে না। সবচেয়ে বড় কথা জাতীয় স্বার্থে একটি স্বাধীন দেশ অন্যান্য কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে কি রাখবে না সেটা একান্ত ব্যক্তিগত, এক্ষেত্রে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। তারপরও কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি সর্বশেষ ভাষণে সৌদি আরবসহ চার আরব প্রতিবেশী দেশের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় এ আহ্বানে প্রতিপক্ষ আদৌও সাড়া দেয় কি-না, নাকি বিদ্যমান সংকট যুদ্ধে রূপ নেয়।
তবে খেয়াল করে দেখার মতো বিষয় হচ্ছে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি-বাহরাইন-মিসর-দুবাই অক্ষশক্তির অর্থনৈতিক অবরোধ কাতার ছাড়াও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে ফিলিস্তিনিদের ওপর। বিশেষ করে গাজার মানুষ এতে বিপাকে পড়বে। দাবি করা হচ্ছে ২০১৪ সালে ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসপ্রায় গাজায় মূলত কাতারের অর্থেই হামাস পুনর্গঠন কার্যক্রম চালাচ্ছিল। কাতার সেখানে ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে বলেও অঙ্গীকার করেছিল তখন। খবরে প্রকাশ ২০১৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত তার প্রতিশ্রুত সহায়তার প্রায় এক পঞ্চমাংশ দিয়েও দিয়েছে। এদিকে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অবরোধে কাতার এখন নিজেই বিপন্ন। ফলে তারা গাজায় প্রদত্ত সহায়তা কাটছাঁট করতে বাধ্য হবে। হামাসের সঙ্গে কাতারের এই নৈকট্যই সৌদি-কাতার মনোমালিন্যের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে এই অবরোধের মূল সুবিধাভোগী হবে ইসরায়েল। ফলে কাতার এখন থেকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের বদলে বিপাকে পড়ে ইসরায়েলের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হবে। আর হামাসকে প্রকাশ্যে কম সহায়তা দেয়ার প্রেক্ষাপট তো আগেই তৈরি হয়ে গেছে। ফলে সৌদি আরবের এই পদক্ষেপে আর কেউ না হোক ইতোমধ্যই সব থেকে সুবিধাভোগী হয়েছে ইসরায়েল।
মনে করে দেখা যায়, কাতারের সঙ্গে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের দহরম-মহরমও চলতি বিবাদের অন্যতম কারণ। ব্রাদারহুডবিরোধী মিসরের জেনারেল সিসি এই অবরোধে বিশেষভাবে মদত দিচ্ছে শুধুমাত্র তার স্বার্থে। পাশাপাশি কাতারস্থ প্রচার মাধ্যম আল-জাজিরার ভূমিকায় জেনারেল আল-সিসি ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে গিয়ে তার গণহত্যা, নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে ব্রাদারহুডের কর্মীদের উপর নির্যাতন এর পুরোটাই ফলাও করে প্রচার করেছে আল-জাজিরা। পাশাপাশি ‘আরব বসন্ত’- সময়কালেও আল-জাজিরার উৎসাহমূলক ভূমিকা অস্বীকারের সুযোগ নাই। এর বাইরে মিসরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে এই সংবাদ মাধ্যমটি যা প্রচার করছে তার সবকিছু সামরিক জান্তা সিসির জন্য বিব্রতকর ও অপমানজনক। অন্যদিকে সৌদ রাজ পরিবারের নানা কুকর্মের দলিল সরাসরি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরায় সৌদি আরবের বিস্তর ক্ষোভ গিয়ে জমেছে কাতার ও তাদের এই চ্যানেলটির ওপর।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। সৌদি বাহিনীর বোমা নিক্ষেপে একটি শবযাত্রায় অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল। এই সংবাদ ফলাও করে প্রচার করেছিল আল-জাজিরা। এর বাইরে ইয়েমেন যুদ্ধ এবং সৌদি আরবের বাহরাইনে আগ্রাসন নিয়ে আল-জাজিরার প্রচার সৌদি আরবকে বিপাকে ফেলেছে। বলতে গেলে এই আল-জাজিরাসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরজুড়ে স্বাধীন গণমাধ্যমে মুক্তমত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টিতে কাতারের ভূমিকা অস্বীকারের সুযোগ নাই। বিশ্বের সবাই জানে যে সৌদি যুবরাজ সালমান এবং আবুধাবির যুবরাজ জায়েদ মিসরের গণতান্ত্রিক সরকারে থাকা মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে জেনারেল সিসি ও দেশটির সামরিক বাহিনীকে বিশেষ সহায়তা দিয়েছিল। ফলে তারা সরাসরি কাতারের বিপক্ষে যাবে এটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। এদিকে অনেকদিন ধরে সৌদি আরব কাতারের কাছ থেকে বাহরাইনের মতো পদলেহি আচরণ আশা করে ব্যর্থ। পাশাপাশি কাতারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তাদের মধ্যে উদ্বেগ জন্ম দিয়েছে। ফলে মিসর-সৌদি আরব-দুবাই জোট তাই কাতারবিরোধী অবরোধ এমন এক সময়ে করেছে যখন দেশটি ২০২২ এর বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্যস্ত। তারা মনে করছে এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং তারা চাপে থাকবে। তবে আরব বসন্ত পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্চের ভূ-রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে এই অবরোধ তারই পরোক্ষ ফল। এখনও এই নাটকের অনেক অংক মঞ্চস্থ হওয়ার বাকি আছে।