Monday, 4 January 2016

শিক্ষকরা ব্যস্ত ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় রাজনীতি নিয়ে

২৭ এপ্রিল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের অচলাবস্থা অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে ২৪ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছেন। সংবাদমাধ্যমে জানতে পারলাম, বৈঠক নাকি ফলপ্রসূ হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা ১৫ দিনের জন্য চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। তবে ১৫ দিন পর তাদের দাবি মেনে নেয়া না হলে তারা আবার আন্দোলন শুরু করবেন বলেছেন। অর্থাৎ সাময়িকভাবে চলমান সংকটের নিরসন ঘটলেও এর স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। 
ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের আনীত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক লাঞ্ছনা ঘটনার বিচার না করা, ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম, সংবাদমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অশালীন ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, অযোগ্য প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা, অমুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তিসহ অন্যান্য অনিয়ম ও দুর্নীতি। ভিসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর মধ্যে অধিকাংশের জোর ভিত্তি নেই। তবে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ নন। কিন্তু তাই বলে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য দিনের পর দিন কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত? 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন নতুন কোনো বিষয় নয়। ইতিপূর্বেও এমন আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে এবং অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমদ, অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জসিম উদ্দীন আহমদ এবং সর্বশেষ অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। পূর্ববর্তী ভিসিদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে বর্তমান ভিসির পদত্যাগের দাবি অযৌক্তিক- এটুকু বলতে পারি। কথাটা কারও পক্ষ কিংবা বিপক্ষ অবলম্বন করে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতেই বলছি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ একজন শিক্ষার্থী হিসেবে লক্ষ্য করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়, ঠিক তখনই শিক্ষকদের একাংশ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু করেন। এসব আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ভিসিকে চাপের মধ্যে রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। কিন্তু যখনই তা ব্যর্থ হয়, আন্দোলন তখন ভিসির পদত্যাগের দাবিতে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ এসব আন্দোলনের নেপথ্যে থাকে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। প্রকৃতপক্ষে এসব আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, এজন্য জাতীয় রাজনীতিও অনেকাংশে দায়ী। দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে এ ধরনের জটিলতা চলতেই থাকবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ভিসি নিয়োগের ফলে শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞানচর্চার চেয়ে দলীয় রাজনীতিচর্চা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভিসির পরিবর্তন হয় কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ কি ফিরে আসে? গত বছরের ২৫ জুলাই ভিসি হিসেবে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভেবেছিলাম সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু গভীর দুঃখ ও হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি- অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না, ভিসি পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বর্পূণ বিষয় হল শিক্ষকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। 
শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে সময়মতো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না। স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। ফলে মারাত্মক সেশনজটের কবলে পড়তে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী। ফলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক ব্যস্ত থাকেন ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় রাজনীতি নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভবত দেশের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীদের চেয়ে শিক্ষকদের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বেশি বিঘিœত হয়। শিক্ষকরা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। অভিভাবকদের কষ্টার্জিত টাকায় তাদের পড়াশোনা চলে। অনেক শিক্ষার্থী টিউশনিসহ বিভিন্ন কাজ করে পড়াশোনার অর্থ জোগাড় করে থাকে। শিক্ষকদের উদ্দেশে বলছি- সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দয়া করে একটু ভাবুন।

Saturday, 2 January 2016

'মুখোমুখি আমি, খোকা আর বৃদ্ধাশ্রম'

পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। গৃহছাড়া অবহেলিত ও অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এ উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে শান রাজবংশ। প্রাচীন চীনে শান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা বর্তমান সমগ্র বিশ্বে প্রসার লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। বার্ধক্যে সবার জন্য শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও স্বস্তিময় জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ডা. একেএম আবদুল ওয়াহেদের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবন এবং পরে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ও হোম ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির ৫০টি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন_ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, ব্র্যাক, ইআইডি, প্রবীণ অধিকার ফোরাম প্রভৃতি প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে।
বৃদ্ধাশ্রম মূলত ওই সব প্রবীণের জন্য, যাদের সন্তানাদি নেই, নেই কোনো আত্মীয়-স্বজন। কিন্তু বর্তমান বৃদ্ধাশ্রমে যে সব প্রবীণ বসবাস করেন তাদের অধিকাংশেরই সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন আছেন। এসব প্রবীণ অধিকাংশই সন্তান কর্তৃক দুর্ব্যবহার কিংবা নির্যাতনের শিকার। সন্তান শ্রদ্ধাবোধ ও কর্তব্যবোধ হারিয়ে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যায়। শেষ বয়সে মানুষ চায় তার সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করতে। জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে। কিন্তু অনেকেরই তা হয় না। পাশ্চাত্যে বৃদ্ধাশ্রম একেবারে স্বাভাবিক। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেই সে স্বাধীন, অনেকটা মা-বাবার নিয়ন্ত্রণমুক্ত। অন্যদিকে মা-বাবা যখন একেবারে বয়সের ভারে বৃদ্ধ তখন তাদের আশ্রয় প্রবীণ আবাসন কেন্দ্র তথা বৃদ্ধাশ্রম অথবা অনেকে থাকেন নিঃসঙ্গ। তার নিত্যসঙ্গী হয়ে যায় কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী। একান্ত আপনজন ব্যস্ত সন্তানরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখতে যাওয়ার জন্য 'মাদারস ডে', 'ফাদারস ডে' পালন করে। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এরূপ ধারণা কি সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আমাদের সমাজে একটি প্রবাদ বাক্য আছে_ যদি কিছু জানতে চাও, তিন মাথার কাছে যাও। এই তিন মাথা বলতে বোঝায় আমাদের প্রবীণ সমাজ। অথচ এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী আজ চরম দুঃখ-দুর্দশায়। অসহায় ও বঞ্চনার মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছে তাদের জীবন। আধুনিক যুগে এসে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বাড়ার কথা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এগুলো বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস করা হয় পিতা-মাতা ভরণপোষণ বিল-২০১৩। বিলে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতামাতার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোথাও বা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্চা করবে। তারা পৃথকভাবে বসবাস করলে সন্তানদের নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে হবে। এ-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেলের বিধান রাখা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইন করে প্রবীণদের প্রতি সব বঞ্চনা, অবহেলা ও বৈষম্য দূর করা কি সম্ভব? ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, কর্তব্যবোধ আইন পাস করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন।
মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ছিল ১৯৯০ সালে ৪০ লাখ ৯০ হাজার। এরপর ১৯৯১ সালে দাঁড়ায় ৬০ লাখে। এখন ১ কোটি ২৫ লাখের বেশি। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ হবে প্রায়। ২০২৬ সালে এ সংখ্যা হবে এখনকার ৭ ভাগ বেড়ে ১০ ভাগে; অথচ ১৯৭৫ সালে সারাবিশ্বে প্রবীণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি। ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকারের ভিত্তিতে স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হলে শিশু ও কিশোর বয়সে সন্তান-সন্তানাদিকে সততা, নৈতিকতা, ধর্মীয় ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, আজকের নবীন ভবিষ্যতের প্রবীণ। বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মায়ের নিরাপদ আবাস। ডিজিটাল যুগের ইট-পাথরের পরিবেশেও অটুট থাকুক মিহি সুতায় বাঁধা পরিবারের সেই স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা।

নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা

নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সারাবিশ্বই এখন সোচ্চার। এর জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন যেমন, WID (Women In Development), GAD (Gender And Development), UN Women-এর উদ্যোগে (He for She campaign) সহ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবছর মার্চ মাসের ৮ তারিখ আন্তর্জাতিক নারী দিবস (আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস) হিসেবে পালিত হয়। অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নারীর ক্ষমতায়ন, মানবতার উন্নয়ন’। নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে যে নারীর ক্ষমতায়ন আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি প্রতিপাদ্য বিষয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে। নারী সৃষ্টির আদিকাল থেকেই পুরুষের নিদারুণ স্বার্থপরতা ও আধিপত্যকামী মানসিকতার শিকার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারী সমঅধিকার ও প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। উনবিংশ শতকে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সমাজজীবনে সবক্ষেত্রে নারীদের পশ্চাত্পদতার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ প্রস্থ (সেলাই করার জন্য) মাপেন! স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা-বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল-ডাউল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন। বিশ্বে নারীদের এখন আর সেই আগের অবস্থা নেই। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। একই সাথে নারীরাও এখন নিজেদের অধিকারের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। অনেক বেশি সোচ্চার। তারা এখন নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশি নারীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। দেশের অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। দেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিক নারী। এ ছাড়া কৃষিক্ষেত্রেও নারীদের ভ‚মিকা গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা যে একধাপ এগিয়ে আছি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ- আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের বাইরে বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নারী অধিষ্ঠিত। এ ছাড়াও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর অংশগ্রহণ তো রয়েছেই। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবদান আজ অনস্বীকার্য। কিন্তু এ সত্তে¡ও নারী তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত! যৌতুক প্রথা, বাল্যবিবাহ, বহু বিবাহ, ধর্মীয় কুসংস্কার, পারিবারিক জীবনে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের আধিপত্য। সমাজে বিদ্যমান মান্ধাতা আমলের প্রথা, কুসংস্কার, ইভটিজিং নামক সামাজিক ব্যাধি ইত্যাদি নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু নারী নির্যাতন ও বঞ্চনা থেমে নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য নারীরা এখনও পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতনসহ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেয়া প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ৩৩৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৩টি। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১২ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮ জনকে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১ জন নারীকে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছেন ৩ জন নারী। অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৪ জন নারীর বেলায়। অপহরণ করা হয়েছে ৭ জন নারীকে। ৫ জন নারী ও শিশুকে পাচার করা হয়েছে। নির্যাতনে হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জন নারী ও শিশুকে। যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১৬ জনকে। এছাড়া ৪ জন গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ৩২ জন নারী-কিশোরীকে। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১ জন নারী। ধর্মের দোহাই দিয়ে ফতোয়ার শিকার হয়েছেন ১ জন নারী। আর নানা বঞ্চনায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ২৯ জন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। জেন্ডার সমতার বিষয়টি যে আজও দেশে পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং নারী যে প্রতিনিয়ত সহিংসতা শিকার হচ্ছে এসব তথ্য সেটাই প্রমাণ করে। সত্যিকারের কাংক্ষিত উন্নয়নের জন্য নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বন্ধ করতে হবে নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা। নারীরাও সমাজের অংশ এবং আমাদের সার্বিক উন্নয়নের অংশীদার এই বোধ সবার মাঝে জাগ্রত করতে হবে। দেশের বৃহত একটা অংশ (নারী) পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই আধিপত্যকামী দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে ।
এ লেখাটি বাংলাদেশ সময় ১৬-০৩-২০১৫ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে ।