Wednesday, 13 April 2016

নুহাশপল্লীতে একদিন

সুয্যি মামার তখনো ঘুম ভাঙেনি। মৃদু আঁধারে বসন্তের হূদয় ছুঁয়ে যাওয়া মৃদু বাতাস। হিমুদের অপেক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  কবি  জসীমউদ্দীন হলের সামনে লাল বাস। ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তির ঘুম উপেক্ষা করে হিমু সাজে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপীঠে পড়ুয়া পাংশা উপজেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির সদস্যরা যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত। সবাই শুভসংঘের বন্ধু। কবি জসীমউদ্দীন হল থেকে সকালের নাশতা করে রওনা হলেন সবাই নুহাশপল্লীর উদ্দেশে। নগরীর বুক থেকে লাল বাস ছুটে চলল কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নিজ  হাতে গড়া প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য খ্যাত নুহাশপল্লীতে। সম্প্রতি এই আয়োজন করেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা।
সড়কপথের দীর্ঘ বাধা পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যস্থানে যখন সবাই পৌঁছলেন তখন নুহাশপল্লীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিমেষেই যেন যাত্রাপথের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। শান্ত প্রকৃতির মাঝে হুমায়ূন আহমেদের আবক্ষ মূর্তি, লীলাবতী দিঘির স্বচ্ছ পানির সৌন্দর্য, পদ্ম ফোটা পুকুরের মাঝে পাথরের মত্স্যকন্যা আর প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের অনুকীর্তি যে কাউকে স্বপ্নজালে আবদ্ধ করবে। সত্যিই নিজ হাতে এক স্বপ্নজগৎ গড়ে তুলেছেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। বাস থেকে নেমেই কেউ লীলাবতী দিঘির পাড়ে, কেউ হুমায়ূন আহমেদের আবক্ষ মূর্তির সঙ্গে, কেউ বা মত্স্যকন্যার সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত। তবে নূসরাত, সম্রাট, সুমনা, রিয়াজুল ও হাফিজুল যেন সবার চেয়ে একধাপ এগিয়ে। অল্প সময়ের মধ্যে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করতেও তাঁরা ভোলেননি। মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দি করতে ভুল করেননি নয়া ফটোগ্রাফার সম্রাট সাকিল। নুহাশপল্লীতে ঘোরাঘুরি শেষে একসঙ্গে দুপুরের একটা জম্পেশ খাওয়ার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একত্র হয় সবাই। অনুষ্ঠানে ফান বক্সের আয়োজন ছিল।
পাংশা উপজেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিচারণা করেন। এ ছাড়া সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আকরাম হোসাইন, আশরাফুল আলম ইকবাল, নেহাল হোসাইন নিজ জন্মস্থান ও ক্যাম্পাসজীবনের স্মৃতিচারণা করেন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম এহতেশাম। কালের কণ্ঠ শুভসংঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেনকে সভাপতি ও আল-আমিনকে সাধারণ সম্পাদক করে পাংশা উপজেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির এক বছরের জন্য নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

Thursday, 31 March 2016

নগরীর ত্রিচক্রযানের ইতিহাস

রাজধানী  ঢাকাসহ  বাংলাদেশের বিভিন্ন  নগরীতে রিক্সা  চলাচল করতে দেখা যায় । ঢাকার  রাজপথ  এখন প্রায় রিক্সার দখলেই । পরিবেশবান্ধব এই  ত্রিচক্রযান নগরে  বসবাসরত  জনগণের দৈনন্দিন  যাতায়াতের অন্যতম  মাধ্যম । সকল শ্রেণির সব বয়সী মানুষের কাছে এর  জনপ্রিয়তা  সমান । ফলে রিক্সা  নগরবাসীর গমনাগমনের  অন্যতম  বাহনে পরিণত হয়েছে । নগরবাসীর  জনপ্রিয়  এ  ত্রিচক্রযানের জন্ম ও বাংলাদেশে এর আগমনী ইতিহাস খুবই চমকপ্রদ ।
রিক্সা আমাদের দেশের যানবাহন না । ১৪৬ বছর পূর্বে মিজি সাম্রাজ্যের সময় অর্থাৎ ১৮৬৮ সালে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে রিক্সার  উদ্ভব হয় । জাপানি শব্দ ‘nj jin-riki-sha’ থেকে রিক্সা শব্দের উৎপত্তি । যার অর্থ হচ্ছে মনুষ্যবাহী বাহন । প্রথমদিকে মূলত ভারি  জিনিস বহনের  জন্য  রিক্সা  তৈরী করা  হয় । কিন্তু ১৮৭০ সালের পর জাপানে রিক্সা  জনগণের  জনপ্রিয় গমনাগমনের  প্রধান বাহনে পরিণত  হয় । তবে জাপানীদের জনপ্রিয় ত্রিচক্রযান ঠিক প্রথম কে আবিষ্কার  করেছিল  তা আজও  অনেকটাই  অজানা । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের জনগণ  জনপ্রিয়  এই ত্রিচক্রযান  আবিষ্কারের কৃতিত্ব  দাবি করেছেন । তাই রিক্সা আবিষ্কারক মূলত কে এই নিয়ে  তর্ক-বিতর্কের শেষ নাই । মার্কিনিরা দাবি করে  যে, ১৮৪৮ সালে আমেরিকার বোস্টন শহরের  মার্কিন কামার অ্যালবার্ট  টোলম্যান  মিশনারীদের  জন্য প্রথম  রিক্সা  তৈরী করেন । অনেকে আবার দাবি করেন মিশনারীদের জন্য নয়, বরং মার্কিন মিশনারী জোনাথন স্কোবি  ১৮৬৯ সালের দিকে নিজের সুবিধার্থে রিক্সা আবিষ্কার করেন । তাদের দাবি স্কোবি থাকতেন জাপানের ইয়াকোহামায়। স্কোবির  স্ত্রী ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী । ফলে তিনি চলাচল করতে পারতেন না । মূলত স্কোবির  স্ত্রীর চলাচলের সুবিধার্থের জন্য তিনি রিক্সা তৈরী  করেন । আবার এও শোনা যায় যে, ১৮৮৮ সালে একজন মার্কিন বাপ্তিস্ত  মিনিস্টার  রিক্সা  আবিষ্কার করেন । অন্যদিকে রিক্সার জন্মস্থান জাপানের জনগণ  দাবি  করেন ইজুমি ইয়োসুকি নামক একজন রেঁস্তোরার মালিক ১৮৬৯ সালে  রিক্সা আবিষ্কার করেন । তবে অধিকাংশ জাপানিরা তিনজন ব্যক্তিকে রিক্সা  আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয় । এরা হলেন- ইজুমি ইয়োসুকি, সুজুজি টোকুজিরো এবং তাকায়ামা কোসুকি । তাদের দাবি- এরা সেই ১৮৬৮ সালেই  রিক্সা আবিষ্কার করেছেন । ফলে ১৮৭০ সালে জাপান সরকার এই তিনজনকে  রিক্সা তৈরীর ও বিক্রির অনুমতি দেয় । এই জন্য রিক্‌সা চালানোর লাইসেন্স হিসেবে এই তিনজনের মধ্যে যে কোন একজনের সীল লাগত অনুমতিক্রমে । মজার বিষয় হচ্ছে - জাপানে  রিক্সার উদ্ভব হলেও এই ত্রিচক্রযান এখন জাপানে প্রচলিত নেই । জাপানে রিক্সা উদ্ভব হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ত্রিচক্রযান প্রসার লাভ করেছে  এবং জনগণের জনপ্রিয়  বাহনে  পরিণত হয়েছে । বিশেষ করে বাংলাদেশের  জনগণের নিকট এর জনপ্রিয়তা  ব্যাপক । তবে জাপান থেকে সরাসরি  বাংলাদেশে এই  ত্রিচক্রযানের আগমন ঘটে নাই । দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম  ভারতের সিমলায় ১৮৮০ সালের দিকে রিক্সার প্রচলন হয় । এর ২০ বছর পর অর্থাৎ ১৯০০ সালের দিকে কলকাতা শহরে রিক্সার প্রচলন হয় । তবে ১৯৬০ সালের দিকে রিক্সার  সাথে চেইন লাগিয়ে দেয়া হয় । যাতে মানুষের পরিশ্রম কম হয় । ৬০-এর দশকে নারায়ণগঞ্জের ও ময়মনসিংহের নেত্রকোনার  ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে চেইন লাগানো  রিক্সা বাংলাদেশে আনেন । আর এভাবেই বাংলাদেশে  রিক্সার  চলাচল শুরু হয় ।

ফিচারটি www.pathshala24.com এ প্রকাশিত হয়েছে । 

Thursday, 18 February 2016

অব্যক্ত অনুভূতি


কম্বলের উষ্ণ পরশ উপেক্ষা করে কুয়াশায় ঘেরা কাকডাকা ভোরে তীব্র শীতের মধ্যে ঘুম থেকে উঠে যায় মেহেদী। প্রায় দুই মাইল রাস্তা সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিনই সময়মতো চৌরাস্তার মোড়ে হাজির হয় তার ভালোবাসার মানুষটিকে একনজর দেখার আশায়। যেদিন সময়মতো আসতে ব্যর্থ হয়, সেদিন আর তার প্রিয়তমার সঙ্গে দেখা হয় না। বীথির মুখখানি না দেখলে মেহেদীর সারাটা দিন মলিন হয়ে যায়। কোনো কাজে তার মন বসে না। সব কিছুই কেমন জানি এলোমেলো হয়ে যায়। বীথি অবশ্য মেহেদীর এ অনুভূতির বিষয়ে কিছুই জানে না। চৌরাস্তার মোড়ে মেহেদীকে প্রায় প্রতিদিনই সকালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা ধারণা করেছে, ছেলেটা হয়তো তাকে পছন্দ করে। কিন্তু সরাসরি যেহেতু এ বিষয়ে মেহেদী তাকে কিছু বলেনি, সুতরাং আগ বাড়িয়ে এমন চিন্তা করা অনর্থক বলে মনে করে সে। এ ছাড়া গ্রামের প্রতিবেশীরা যদি বিষয়টা জানতে পারে, তাহলে তিলকে তাল বানিয়ে ছাড়বে। চুপচাপ থাকাই ভালো। দেখা যাক কী হয়-মনে মনে এসব ভেবে বীথিও মেহেদীকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। তবে মেহেদীর জন্য যে তার মনের মধ্যে নিজের অজান্তেই একটা জায়গা তৈরি হয়েছে, এটা সে ভালোভাবেই বুঝতে পারে। এ ছাড়া মেহেদীকে নিয়ে কেনই বা সে ভাবতে যাবে! প্রতিদিনের মতো আজও কাকডাকা ভোরে মেহেদী রাস্তার মোড়ে বীথির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সাইকেলটা রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। সাইকেলের পেছনে এক-দুইটা বই-খাতা। খাতার ভাঁজে দুটি লাল গোলাপ জড়ানো। প্রাইভেট পড়ার উদ্দেশ্যে সে মূলত বাড়ি থেকে প্রতিদিন বের হয়। কিন্তু বীথির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অধিকাংশ দিনই তাঁর প্রাইভেট পড়া হয় না। মেহেদী আজ বীথিকে তার ভালোবাসার কথা বলবে বলে ঠিক করেছে। ভোরবেলা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিদিনই সে এ কথা ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বলা হয় না। এ ব্যর্থতার কারণে প্রায়ই বন্ধুদের কাছে তাকে গালাগাল শুনতে হয়। এরই মধ্যে বন্ধুরা তাকে ‘ভীতুর ডিম’ নামে ডাকা শুরু করেছে। মেহেদীর জন্য ব্যাপারটা ইনসাল্টিং। সে আর এ ধরনের অপমান সহ্য করতে রাজি না। তাই আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে করেই হোক বীথিকে সব কথা খুলে বলবেই। প্রথমে ভেবেছিল, একটা চিঠির মাধ্যমে বীথিকে সব কথা জানাবে। কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখল, ভীরুর মতো চিঠি দেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া ডিজিটাল যুগে চিঠিপত্র খুব বেমানান। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাহসী পুরুষের মতো বীথির হাতে লাল গোলাপ ধরিয়ে দিয়ে অব্যক্ত অনুভূতি সরাসরি ব্যক্ত করবে। চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথাই ভাবছে মেহেদী। হঠাৎ দূরে তাকিয়ে দেখল, বীথি আসছে। প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য তার গায়ে হালকা গোলাপি রঙের চাদর মোড়ানো। ওড়না দিয়ে মুখের প্রায় অর্ধেকটা ঢাকা। শীতের কুয়াশা আবৃত সকালে অন্য মানুষ চিনতে কষ্ট হলেও বীথিকে চিনতে মেহেদীর কোনো কষ্ট হয় না। বীথির আগমনী বার্তায় মুহূর্তের মধ্যে মেহেদীর হৃদয়ে স্পদন বেড়ে গেল। এত সময়ের ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে এলোমেলো হয়ে গেল। কী করা উচিত আর কী করা অনুচিত-এ ভেবেই সে বিচলিত হয়ে উঠল। প্রতিদিনের মতো আজও বীথি তার সামনে দিয়ে চলে গেল; কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। লাল গোলাপ দুটি খাতার ভাঁজেই পড়ে থাকল। এভাবেই অসংখ্য তাজা গোলাপ মেহেদীর খাতার ভাঁজে শুকিয়ে শুকিয়ে নষ্ট হয়েছে। একটি একটি করে ঝরে পড়েছে লাল পাপড়ি। অনেক দিন পর অপ্রত্যাশিতভাবে একটা হোটেলের সামনে মেহেদীর সঙ্গে বীথির দেখা হয়। সেদিনও বীথিকে ডেকে কথা বলার সাহস হয়নি মেহেদীর। তবে আগের মতো বীথি এদিন আর মেহেদীর সঙ্গে কথা না বলে যায়নি। আপনি মেহেদী ভাই না? বীথির এ প্রশ্নে মুহূর্তের মধ্যেই মেহেদীর কাকডাকা ভোরের হারানো স্মৃতি হৃদয়ের মানসপটে ভেসে ওঠে। বীথির চিরচেনা মুখখানি যেন অচেনা মনে হয় তার কাছে। আনমনা হয়ে সে বীথির মুখপানে চেয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে। কেমন আছেন আপনি? ‘শীতের সকালে বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা ঠিক সেই লাল গোলাপের মতো। প্রিয়তমার হাতের স্পর্শ পাওয়ার সৌভাগ্য কারোই যে হয়নি’-বীথির প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে কৃত্রিম হাসি দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে কথাগুলো বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে মেহেদী।

মীর মশাররফের স্মৃতিধন্য ‘পদমদী’

পদ্মাপাড়ের জেলা রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার অন্তর্গত সবুজে ঘেরা গ্রাম নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী। ১৯ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাত বিষাদসিন্ধুর অমর লেখক মীর মশাররফ হোসেনের সমাধিস্থলকে ঘিরে গ্রামটি এখন দেশে-বিদেশে অনেকের কাছেই পরিচিত। মীর মশাররফ হোসেন কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করলেও তার জীবনের প্রায় পুরো সময় তিনি অতিবাহিত করেছেন পৈতৃক নিবাস নবাবপুর ইউনিয়নের এ পদমদী গ্রামে।
এখানে বাসকালেই মীর মশাররফ হোসেন তার জীবনের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, নাটক, আত্মজীবনী, অনুবাদ ও প্রবন্ধ রচনা করেন। ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর পদমদী গ্রামেই তাকে সমাহিত করা হয়। তিনিসহ এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তার স্ত্রী, বড় ভাই ও ভাবি। মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মীর মোয়াজ্জেম হোসেন ও মা দৌলতন নেছা। আজিজুন্নেসার সঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনের প্রথম বিয়ে হয়। কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। তাই প্রথম বিয়ের আট বছর পর মীর মশাররফ হোসেন কুলসুম বিবিকে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী আজিজুন্নেসার গর্ভে কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি। মীর মশাররফ হোসেনের পাঁচ পুত্র ও ছয় কন্যা— সবাই বিবি কুলসুমের গর্ভজাত। মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতি ধরে রাখতে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে পদমদী গ্রামে ১৯৯ শতক জমির ওপর নির্মিত হয় মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ১৯ এপ্রিল এ স্মৃতিকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২৫৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমি কেন্দ্রটির কাজ বাস্তবায়ন করে। তার পর ২০০৫ সালের ২০ এপ্রিল এটি উদ্বোধন করেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মূল ফটক দিয়ে স্মৃতিকেন্দ্রে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ব্রোঞ্জের তৈরি মীর মশাররফ হোসেনের আবক্ষ ভাস্কর্য। এর সামান্য একটু সামনেই বক্রাকার দেয়ালের মধ্যে সাধারণ নকশায় চারটি সারিবদ্ধ কবর। এর দ্বিতীয় (ডান থেকে) কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত কিংবদন্তির সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন। ডান থেকে প্রথম কবরটি তার স্ত্রী বিবি কুলসুমের, তার পরের (তৃতীয়) কবরটি তার ভাবি বিবি খোদেজা বেগম ও চতুর্থ কবরটি তার ভাই মীর মোকাররম হোসেনের। কবরের চারপাশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য মাজারে ফেয়ার ফেস ব্যাকওয়াল নির্মাণের মধ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক স্থাপনা। এছাড়া স্মৃতিকেন্দ্রটিতে রয়েছে ১০০ আসনবিশিষ্ট সুসজ্জিত সেমিনার কক্ষ, সংগ্রহশালা, দফতর, পাঠাগার, প্রায় দুই হাজার গ্রন্থসংবলিত একটি গ্রন্থাগার, সহপরিচালকের কক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষ, বিশেষ অতিথি কক্ষ, অতিথি কক্ষ, আবাসন কর্মকর্তার কক্ষ, সহ-আবাসন পরিচালকের কক্ষ, ডাইনিং, কিচেন ও প্রসাধন কক্ষ। উদ্বোধনের পর এ স্মৃতিকেন্দ্রের তত্ত্বাবধানের জন্য বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে একজন সহকারী পরিচালকসহ মোট পাঁচজন কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দারোয়ান ছাড়া কারোরই দেখা পাওয়া গেল না। গ্রন্থাগার, পাঠাগার, সংগ্রহশালাসহ প্রায় সব কক্ষই বন্ধ।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারলাম, স্মৃতিকেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশেষ কোনো দিন ছাড়া এখানে আসেন না। স্মৃতিকেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু শুক্র ও শনিবারসহ যেকোনো সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। স্মৃতিকেন্দ্রটি সবার জন্য উন্মুক্ত। বাংলা একাডেমি থেকে অনুমতি নিয়ে আসা ব্যক্তিরা এখানে আবাসন, খাদ্য ও লাইব্রেরি সুবিধা পান। এছাড়া সাধারণের জন্য এখানে আবাসন ও খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে পদমদী থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে বালিয়াকান্দি বাজারে খাবারের ছোট হোটেল রয়েছে। আর কেউ রাতযাপন করতে চাইলে তাকে রাজবাড়ী শহরে যেতে হবে। প্রতি বছর বাংলা একাডেমি তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে এখানে সীমিত আকারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উত্সবকে কেন্দ্র করে স্থানটি দেশের বিখ্যাত ব্যক্তি ও কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ গবেষণার সুযোগ ও উপাদানের অভাবে অমর এ কথাসাহিত্যিকের স্মৃতিকেন্দ্রটি আজো গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়, ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র’ নামকরণ করা হলেও এখানে মীর মশাররফ হোসেনের কবর ব্যতিত তার ব্যবহূত কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে অমর এ সাহিত্য স্রষ্টাকে তুলে ধরতে হলে এবং স্মৃতিকেন্দ্রটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গবেষক ও পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এর সার্বিক উন্নয়ন সাধন আবশ্যক।